বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনী, কবিতা এবং গ্রন্থসমূহ

আসমা আক্তার শান্তা
প্রকাশকাল (১৬ এপ্রিল ২০১৭)

f
g+
t

দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি-নিশীথে, যাত্রীরা হুশিয়ার! বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুলের লেখনীতে ফুটে উঠেছে মাজলুমানের অত্যাচারের বিরুদ্ধে জেগে উঠার উদাত্ত আহ্বান। তার কবিতা, গান, গল্প এবং তার সমগ্র জীবন দিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে গিয়েছেন। কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন রণাঙ্গনের বীর যোদ্ধা। কবি কাজী নজরুল ইসলাম দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর বাঙ্গালি প্লাটুনের সৈনিক ছিলেন।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনী, কবিতা এবং গ্রন্থসমূহ

ছবি আসমা আক্তার শান্তা

সুকুমার রায় এর জীবনী, গল্প, কবিতা এবং রচনা সমগ্র

জীবনানন্দ দাসের সকল কবিতা, গল্প, রচনাবলী এবং জীবনী

ছোট সময় থেকে কষ্টের সাথে তার গভীর বন্ধুত্ব ছিল। তার জীবনের দুঃখের প্রাচুর্যের কারনে তাকে দুখু মিয়া বলা হত। সমাজের ধনী দারিদ্র্যের বৈষম্য এবং সমকালীন নানা অত্যাচার নিপীড়ন তাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল যার প্রমান পাওয়া গিয়ছে তার লেখনীর মাধ্যমে।

তার লেখনীর মধ্যে ফুটে উঠেছে তার মনের অনুভুতি "বিদ্রোহী রণক্লান্ত সেই দিন আমি হব শান্ত, যবে বাতাসে ধ্বনিবেনা উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল" সহ আরও অনেক লেখনীর মাধ্যমে।

বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামের এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ফকির আহমেদ এবং মাতা জায়েদা খাতুন।

কাজী নজরুলের জীবনের প্রথম পর্যায় শুরু হয় ইসলামি শিক্ষার মাধ্যমে। তিনি কিছুদিন মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবেও কাজ করেছেন। নজরুলের বর্ণাঢ্য জীবনে অনেক পেশার মাধ্যমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ায় করেছেন।

নজরুল স্থানীয় মক্তব থেকে কুরয়ান,ধর্ম, ইসলাম, দর্শন এবং ইসলামী ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন শুরু করেন। ১৯০৮ সালে পিতার মৃত্যুর পর ৯ বছর বয়সে তার শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হয়। দশ বছর বয়সে মক্তব থেকে নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এই মক্তবে শিক্ষকতার পাশাপাশি মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেন।

কৈশোরে বিভিন্ন থিয়েটার দলের সাথে কাজ করতে গিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম কবিতা, নাটক এবং সাহিত্য সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান লাভ করেন। তারপর আসানসোলে এসে এক রুটির দোকানে কাজ নেন, এখানে সময় পেলে তিনি সুর করে পুথি পড়তেন।

কাজী রফিজউদ্দিন নামে আসানসোলের দারোগা নজরুলের প্রতিভা দেখে তাঁকে ময়মনসিংহের দরিরামপুর স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। তিন বছর পর তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যান। এরপর ১৯১৭ সালের শেষ দিকে নজরুল ভারতীয় সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন।

আড়াই বছর চাকরি করার পর ১৯২০ সালে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দিলে তিনি সৈনিক জীবন ত্যাগ করেন। আমাদের বিদ্রোহী কবি সৈনিক জীবনে থাকাকালে অনেক কবিতা ও গল্প লিখেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো - মুক্তি কবিতা, গল্পের মধ্যে - হেনা, ঘুমের ঘোরে, মেহের নেগার,কবিতা সমাধি ইত্যাদি।

সেনাবাহিনীতে কিছুদিন কাজ করার পর আমাদের জাতীয় কবি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। এই সময় তিনি বিট্রিশ রাজার বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে বিদ্রোহী ও ভাঙ্গার গান কবিতা এবং ধূমকেতুর মতো সাময়িকী প্রকাশ করেন।

জেলে বন্দী থাকার সময় কাজী নজরুল ইসলাম রাজবন্দীর জবাববন্দী প্রবন্ধে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করেন। এছাড়া তিনি লাঙল পত্রিকারও সম্পাদক ছিলেন।

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২১ সালে এপ্রিল - জুন মাসে মুসলিম সাহিত্য সমিতির গ্রন্থ প্রকাশক আলী আকবর খানের সাথে কুমিল্লা বিরজাসুন্দরী দেবির বাড়িতে প্রমীলা দেবীর সাথে তার প্রথম পরিচয় ও পরে তাকে বিয়ে করেন।

অবশ্য এর আগে নজরুলের বিয়ে ঠিক হয় আলী আকবর খানের ভগ্নী নার্গিস আরার খানমের সাথে। বিয়ের আখত সম্পন্ন হবার পর নজরুলের ঘর জামাই থাকা নিয়ে বিরোধ হওয়ায় বাসর হওয়ার আগে তিনি নার্গিসকে রেখে বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে চলে যান।

তখন নজরুল খুব অসুস্থ হয়ে পড়ায় প্রমীলা দেবী তার সেবা যত্ন করেন এবং এক পর্যায়ে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। নজরুলের জীবনে দুই নারীর আগমন ঘটলেও তিনি প্রমীলা দেবীর সাথে বিবাহিত জীবন কাটান। সাম্যবাদী কবি নজরুল ইসলাম মুসলিম হয়েও চার সন্তানের নামকরণ করেন মুসলিম ও হিন্দু নামের সংমিশ্রণে।

বিদ্রোহ কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে ভালোবাসা, মুক্তি এবং বিদ্রোহ। ছোটগল্প, নাটক, উপন্যাস লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবে বেশি পরিচিত। নজরুল এর বিদ্রোহী কবিতা ও ভাঙ্গার গান সঙ্গীত, বাংলা কবিতা ও গানের ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

নজরুল এর অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থ বাংলা কবিতায় এক মাত্রা যোগ করে। এই কাব্যগ্রন্থে আগমনী, বিদ্রোহী, প্রলয়োল্লাস, খেয়াপারের তরুণী, কামালপাশা ইত্যাদি কবিতা রয়েছে। কাজী নজরুল ইসলামের প্রেমের কাব্যগ্রন্থের মধ্যে দোলন - চাঁপা, ছায়ানট, চক্রবাক ইত্যাদি।

এছাড়া অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে বিষের বাঁশি, প্রলয়শিখা,সাম্যবাদী, ফণিমনসা, সিন্ধু - হিন্দোল উল্লেখযোগ্য। নজরুল ইসলাম প্রায় তিন হাজারের মতো গান লিখেছেন এবং নিজেই সেগুলোতে সুর দিয়েছেন। তার মধ্যে নজরুল গীতি, রণসঙ্গীত, ইসলামী গান, ভক্তিমূলক স্তুতিগান উল্লেখযোগ্য।

তিনি বুলবুল, জুলফিকার, চোখের চাতক, চন্দ্রবিন্দু ইত্যাদি গানের বই লিখেছেন। নজরুলের প্রথম গল্প বাউণ্ডেলের আত্নকথা। উপন্যাস বাঁধন-হারা, মৃত্যুক্ষুধা ইত্যাদি। শিশুতোষ কবিতা ছাড়াও নাটক, ছোটগল্প, নজরুল সঙ্গীত, ইসলামি গান বা গজল এবং লাঙল ও ধুমকেতুর মতো পত্রিকার সম্পাদনা করেন।

কাজী নজরুল ইসলাম পিক্স ডিজিজে আক্রান্ত হন। এর ফলে তিনি সাহিত্যকর্ম থেকে আমৃত্যু বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ১৯৪২ সালে কাজী নজরুল বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন।

অনেক দিন অসুস্থ থাকার পর বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে তিনি ১৯৭২ সালের ২৪ মে সপরিবারে ঢাকা আসেন। ১৯৭৬ সালে কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশের জাতীয়তা প্রদান করা হয়।

আমাদের জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার পিজি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। নজরুল তার একটি গানে লিখেছেন মসজিদেরই কাছে আমায় কবর দিয়ো ভাই।

যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সমাধিস্থ করা হয়।

মোটকথা, বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৭৬ সালে কবিকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

কাজী নজরুল ইসলাম জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে প্রেমের কবিতা, বিদ্রোহী কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, ইসলামী গান, নজরুল গীতি, শিশুতোষ কবিতা ইত্যাদি দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন।

তাই বাংলাদেশে কাজী নজরুল ইসলামকে স্মরণ করে ২০০৫ সালে ত্রিশালে ( বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায়) কাজী নজরুল ইসলাম নামক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া নজরুল একাডেমী, বুলবুল ললিতকলা একাডেমী, নজরুল ইন্সটিটিউট স্থাপিত হয়।

কাজী নজরুল ইসলাম এর অমিয় রচনাবলীতে আমরা দেখি তিনি শাণিত কথায় নিপীড়নের প্রতিবাদ জানিয়েছেন, অন্যায়ের কাছে তিনি কখনো মাথা নত করেননি। তাই অসহায় মানুষের সংগ্রামী চেতনায় আমাদের জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন এবং থাকবেন চিরদিন।

আসমা আক্তার শান্তা-এর আরও প্রবন্ধ পড়ুন

* ক্যারামেল পুডিং বানানোর সহজ রেসিপি | পুডিং তৈরির পদ্ধতি

* তৈরি করে নিন মজার খাবার - ছোলার ডালের কচুরি রেসিপি

* খুব সহজে জেনে নিন কোন খাবারে কোন ভিটামিন আছে

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

আরও প্রবন্ধ পড়ুন



বিজ্ঞাপন



© ২০১৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত LearnArticle.com