মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং বাংলা সাহিত্যে তার অবদান

আসমা আক্তার শান্তা
প্রকাশকাল (০৩ জুন ২০১৭)

f
g+
t

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলার নবজাগরণ সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত হিন্দু কায়স্থ পরিবারে মধুসুদন দত্তের জন্ম হয়। তিনি ছিলেন রাজনারায়ণ দত্ত ও তার প্রথমা পত্নী জাহ্নবী দেবীর একমাত্র সন্তান।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং বাংলা সাহিত্যে তার  অবদান

ছবি আসমা আক্তার শান্তা

সুকুমার রায় এর জীবনী, গল্প, কবিতা এবং রচনা সমগ্র

মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমেদের সকল কবিতা ও রচনাবলী

মধুসূদনের প্রাথমিক শিক্ষা তার মা জাহ্নবী দেবীর কাছে। জাহ্নবী দেবী তাঁকে রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ প্রভূতির সাথে সুপরিচিত করে তোলেন। তেরো বছর বয়সে মধুসূদন কলকাতায় একটি স্কুলে পড়ার পর তিনি তদানীন্তন হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। ১৮৪৩ সালে তিনি খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করে মাইকেল নামকরণ করেন।

রাজনারায়ণ দত্ত বিধর্মী পুত্রকে ত্যাজ্য পুত্র ঘোষনা করেন। এরপর মাইকেল মধুসুদন শিক্ষার জন্য মাদ্রাজে চলে যান। মাদ্রাজে এসে তিনি ইংরেজি পত্রপত্রিকায় লিখতে শুরু করেন।

পঁচিশ বছর বয়সে তিনি প্রথম কাব্য ক্যাপটিভ লেডি রচনা করেন। কবি আইন বিষয়ে পড়ার জন্য ইংল্যান্ডে যান। সেখানে বিশেষ সুবিধা না হওয়ায় তিনি ১৮৬০ সালে ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে চলে যান।

মাদ্রাজে আসার কিছুকাল পরে মধুসূদন রেবেকা ম্যাকটিভিস নামে এক ইংরেজ যুবতীকে বিবাহ করেন। আট বছর পর তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপর তিনি এক ফরাসি তরুণীকে বিয়ে করেন এবং তাকে তিনি সারাজীবনের সঙ্গিনী করেন। তাদের নেপোলিয়ান নামক এক ছেলে এবং শর্মিষ্ঠা নামক এক মেয়ে ছিলেন।

মধুসূদন দত্ত নাট্যকার হিসেবে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে পর্দাপণ করেন। ১৮৫৯ সালে তিনি বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম মৌলিক নাটক শর্মিষ্ঠা রচনা করেন। ১৮৬০ সালে তিনি রচনা করেন দুটি প্রহসন যথা- একেই কি বলে সভ্যতা এবং বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ এবং পূর্ণাঙ্গ পদ্মাবতী নাটক।

পদ্মাবতী নাটকে তিনি প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেন। এরপর তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য, মেঘনাদবধ কাব্য, ব্রজাঙ্গনা কাব্য, কৃষ্ণকুমারী নাটক, বীরঙ্গনা কাব্য এবং ১৮৬৬ সালে চতুর্দশী কবিতা।

বাংলা সাহিত্যের প্রবাদ পুরুষ বাংলা কবিতায় অমিত্রাক্ষর ছন্দের অমর কারিগর রুপকার মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত আমাদের বাংলা কবিতার ভুবনে প্রথম আধুনিক ও কালজয়ী কবি এবং আধুনিকতার প্রবর্তক।

মাইকেল মধুসূদনের হাত ধরে আঠারো শতকে বাংলা কবিতায় আধুনিকতার সেই যে অঙ্কুর বীজ বপন করা হয়েছে তারই ধারাবাহিতায় বর্তমান কাল পর্যন্ত বাংলা কাব্যে প্রসার প্রচার ঘটেছে। মাইকেল মধুসূদন দত্তের বিভিন্ন রচনায়, কবিতায়, মহাকাব্য, নাটক, প্রহসনে মানবতারই জয়গান গেয়েছেন।

এখানে তার অমর সৃষ্টি মহাকাব্য মেঘনাদবধ কাব্যে লংকার অধিপতি রাবণ চরিত্রে স্পষ্ট প্রকাশ ঘটিয়েছেন একান্ত মানবতাবাদের। পাশাপাশি তার বীরাঙ্গনা কাব্যের মাধ্যমে তিনি সমাজে, পরিবারে নিষ্পেষিত, অবহেলিত ও নির্যাতিত নারীদের মুক্তির জন্য সাহসিকতার জয়গান গেয়েছেন।

এছাড়া কৃষ্ণবিরহে রাধিকার হৃদয়ে পাহাড়সম বেদনা, কষ্ট ও যন্ত্রনার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছেন। তাছাড়া কবির অনবদ্য সৃষ্টি তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য ও আধুনিকতার প্রকাশ। তার কাব্যে আমরা পেয়েছি স্বাধিকার আন্দোলনের চেতনাবোধ। তার সনেট কবিতায় পরতে পরতে আধুনিকতার ছোয়া স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

দেশ, মানুষ, প্রকৃতি এবং নদ- নদীর ক্ষেত্রেও তিনি ভালোবাসা স্বাধিকার চেতনা মূল্যায়ন করেছেন। কবি মধুসূদনের জনক বাংলা কবিতা আধুনিকতার পরশে বিশ্বসাহিত্যে এক উত্তমরূপে স্থান করে নিয়েছে। তাই বাংলা কবিতায় আধুনিকতার স্রষ্টা মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

মধুসূদনের শেষ জীবন চরম দুঃখ ও দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। ৪৯ বছর বয়সে ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জুন আলিপুর জেনারেল হাসপাতালে অর্থাভাবে অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মহাকবি জীবনের অন্তিম পর্যায়ে জন্মভূমির প্রতি সুগভীর ভালোবাসার চিহ্ন রেখে গেছেন অবিস্মরণীয় পংক্তিমালায়।

মোটকথা, কবি মধুসুদন অমিত্রাক্ষর ছন্দের চতুর্দশপদী পত্রকাব্য, মহাকাব্য, গীতি কবিতা রচনা করে বাংলা কবিতায় যে আধুনিকতার অবদান রেখেছেন তা কবি সাহিত্য প্রেমিদের ও নতুন প্রজন্মদের কাছে কবিকে চিরভাস্মর করে রাখবে।

আসমা আক্তার শান্তা-এর আরও প্রবন্ধ পড়ুন

* স্বাস্থ্য ভালো রেখে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন গড়ুন

* প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় ব্যবস্থাপনা এবং পূর্ব প্রস্তুতি

* হুমায়ূন আহমেদ এর জীবনী, কবিতা, নাটক, গল্প এবং উপন্যাস সমগ্র

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

আরও প্রবন্ধ পড়ুন



বিজ্ঞাপন



© ২০১৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত LearnArticle.com